Banner ads

ফিলিস্তিনি এবং গাজার বর্তমান অবস্থা

ফিলিস্তিনি এবং গাজার বর্তমান অবস্থা 



 বর্তমান প্রেক্ষাপট:

গাজা উপত্যকা একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের জের ধরে ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযানের ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই অভিযানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, বিপুল সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং অসংখ্য প্রাণহানি ঘটেছে।


বর্তমান পরিস্থিতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক:

১. চলমান সামরিক অভিযান:* 

ইসরায়েলি তৎপরতা: ইসরায়েলি সামরিক অভিযান গাজা উপত্যকার বিভিন্ন অংশে অব্যাহত রয়েছে, যদিও এর তীব্রতা এবং নির্দিষ্ট স্থান পরিবর্তিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মূল ফোকাস ছিল মিশরের সীমান্তবর্তী দক্ষিণের শহর রাফাহ। ইসরায়েল বলছে, তাদের লক্ষ্য হামাসের অবশিষ্ট ব্যাটালিয়ন এবং পরিকাঠামো ধ্বংস করা এবং সম্ভাব্য জিম্মিদের খুঁজে বের করা।*


 স্থল ও বিমান হামলা: অভিযানে স্থল সেনা, ট্যাঙ্ক, তীব্র বিমান হামলা এবং ড্রোন নজরদারি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উত্তর গাজার কিছু অংশ (যেমন জাবালিয়া, যেখানে লড়াই আবার শুরু হয়েছে), মধ্য গাজা এবং রাফাহ সহ বিভিন্ন এলাকায় এই অভিযান চলছে।*


 হামাসের কার্যকলাপ: ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, হামাস এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনও সক্রিয় রয়েছে। তারা ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা ধরনের হামলা চালাচ্ছে, রকেট নিক্ষেপ করছে (যদিও আগের চেয়ে কম এবং স্বল্প পাল্লার) এবং টানেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে।* 


বেসামরিক নাগরিকদের বিপদ: ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে প্রচণ্ড লড়াই বেসামরিক নাগরিকদের চরম বিপদের মুখে ফেলেছে। বিমান হামলা এবং স্থল যুদ্ধে বেসামরিক হতাহতের খবর নিয়মিত আসছে। প্রকৃতপক্ষে "নিরাপদ" অঞ্চল খুঁজে পাওয়া কার্যত অসম্ভব।


২. মানবিক সংকট - ভয়াবহ পরিস্থিতি:*

 ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি: গাজার জনসংখ্যার বেশিরভাগই (আনুমানিক ২২ লক্ষের মধ্যে ১৭ লক্ষেরও বেশি) অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অনেকে একাধিকবার। মানুষ প্রথমে দক্ষিণে পালিয়ে গিয়েছিল এবং রাফাহতে ব্যাপকভাবে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু সেখানে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি অভিযানের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ আবারও পালাতে বাধ্য হয়েছে। তারা প্রায়শই আল-মাওয়াসি বা মধ্য গাজার (যেমন দেইর আল-বালাহ) মতো নির্দিষ্ট "মানবিক অঞ্চলে" আশ্রয় নিচ্ছে, যেগুলি ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত জনবহুল, মৌলিক পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে এবং হামলা থেকে মুক্ত নয়।*


 আশ্রয়: মানুষ তাঁবুতে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে, জাতিসংঘের ভিড়ে ঠাসা আশ্রয়কেন্দ্রে বা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। স্যানিটেশন, গোপনীয়তা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া বা সংঘাত থেকে সুরক্ষার অভাবের কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। अनुमान করা হচ্ছে যে প্রায় ৬০-৭০% বা তারও বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।* 


খাদ্য নিরাপত্তা: ব্যাপক ক্ষুধা এবং দুর্ভিক্ষের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে উত্তর গাজায় যা দীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছিন্ন ছিল। সম্প্রতি কিছু সাহায্য উত্তরে পৌঁছালেও বিতরণ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। পুরো গাজায় পর্যাপ্ত, পুষ্টিকর খাবারের যোগান অত্যন্ত সীমিত। মানুষ প্রায় সম্পূর্ণরূপে মানবিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বাজারে খাবার নেই বললেই চলে এবং যা পাওয়া যায় তার দাম আকাশছোঁয়া।* 


পানি ও স্যানিটেশন: বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কম। পানির পরিকাঠামো (পাইপলাইন, ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট, কূপ) ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা চালানোর জন্য জ্বালানির অভাব রয়েছে। মানুষ অনিরাপদ জল পান করতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস-এ এবং সম্ভাব্য কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি ও প্রকোপ বাড়ছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যার ফলে রাস্তাঘাটে এবং আশ্রয়কেন্দ্রের আশেপাশে আবর্জনা স্তূপাকার হচ্ছে, যা স্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।*


 স্বাস্থ্য ব্যবস্থার انهيار (ভেঙে পড়া): গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রায়। অনেক হাসপাতাল সরাসরি আঘাত, অবরোধ, জ্বালানির অভাব, কর্মীদের অভাব (নিহত, আহত, বাস্তুচ্যুত বা কর্মস্থলে পৌঁছাতে অক্ষম) এবং ওষুধ ও সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতির কারণে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অবশিষ্ট হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে জর্জরিত। প্রায়শই পর্যাপ্ত অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে এবং তারা ট্রমা, অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্থাপিত ফিল্ড হাসপাতালগুলো কিছুটা স্বস্তি দিলেও একটি কার্যকরী ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং বিপজ্জনক।*


 রোগের প্রাদুর্ভাব: দুর্বল স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানির অভাব, অপুষ্টির কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ভিড় সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার জন্য আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, চর্মরোগ (যেমন স্ক্যাবিস এবং উকুন) এবং গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল অসুস্থতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।


৩. ত্রাণ বিতরণ ও প্রবেশাধিকার:*

অপর্যাপ্ত ত্রাণ: আন্তর্জাতিক আহ্বান এবং প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, গাজায় প্রবেশ করা ত্রাণের পরিমাণ বিপুল চাহিদা মেটাতে একেবারেই অপ্রতুল।*


 প্রবেশ পথ: মিশরের রাফাহ ক্রসিং এবং ইসরায়েলের কেরেম শালোম ক্রসিং-এর মতো প্রধান প্রবেশ পথগুলি নিরাপত্তা উদ্বেগ, নিকটবর্তী লড়াই এবং লজিস্টিক সমস্যার কারণে বন্ধ, ব্যাহত বা সীমিত ক্ষমতার সম্মুখীন হয়েছে। ক্রসিংগুলির উপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ত্রাণ প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। সম্প্রতি, ইসরায়েলি বাহিনী রাফাহ ক্রসিংয়ের গাজা প্রান্তের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এর মাধ্যমে চলাচল বন্ধ রয়েছে।*


 বিতরণের চ্যালেঞ্জ: গাজার অভ্যন্তরে ত্রাণ পৌঁছানো এবং তা নিরাপদে ও কার্যকরভাবে বিতরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, চলমান লড়াই, ট্রাকের জন্য জ্বালানির অভাব, ত্রাণ কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি (অনেকে নিহত হয়েছেন) এবং সমন্বয়ের অসুবিধা প্রচেষ্টা ব্যাহত করছে। ত্রাণ কনভয়গুলিতে হামলা বা হতাশার কারণে লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।* বিকল্প পথ: আকাশ থেকে ত্রাণ ফেলা (এয়ারড্রপ) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক জেটির মতো প্রচেষ্টা কিছু সাহায্য সরবরাহ করেছে, তবে এগুলি স্থল রুটের চেয়ে জটিল, কম কার্যকর এবং স্থল ক্রসিং দিয়ে বড় আকারের ট্রাক কনভয়ের বিকল্প হতে পারে না।


৪. বেসামরিক জীবন ও পরিকাঠামো:* হতাহতের সংখ্যা: গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক রিপোর্টকৃত মৃতের সংখ্যা (যা যোদ্ধা এবং বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে পার্থক্য করে না) ৩৬,০০০ ছাড়িয়ে গেছে, এবং আরও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নারী ও শিশু। হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে বলেও জানা গেছে, যারা সম্ভবত ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। সংঘাত চলাকালীন সঠিক সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা অসম্ভব।* 


পরিকাঠামোর ধ্বংসযজ্ঞ: রাস্তা, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, গির্জা, বিদ্যুৎ গ্রিড, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং কৃষি জমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।* 


যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: পরিকাঠামোর ক্ষতি বা ইচ্ছাকৃত বন্ধের কারণে ইন্টারনেট এবং ফোন পরিষেবা ঘন ঘন ব্যাহত হচ্ছে, যা বেসামরিক নাগরিকদের যোগাযোগ, উদ্ধার প্রচেষ্টা এবং সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি করছে।* মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: প্রিয়জন হারানো, বাস্তুচ্যুতি, অবিরাম ভয়, মৌলিক চাহিদার অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে জনগণ চরম মানসিক আঘাতের শিকার হচ্ছে।


৫. রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি:* 

যুদ্ধবিরতির আলোচনা: কাতার, মিশর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় মাঝে মাঝে যুদ্ধবিরতি এবং হামাসের হাতে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের হাতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে। তবে শর্তাবলী নিয়ে মৌলিক মতানৈক্যের কারণে, বিশেষ করে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলি সৈন্যের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার নিয়ে, এই আলোচনা বারবার স্থগিত হয়েছে।*


 আন্তর্জাতিক চাপ: মানবিক পরিস্থিতি এবং বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে ইসরায়েলের উপর উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ)-এর আদেশ, যা ইসরায়েলকে গণহত্যা প্রতিরোধ এবং ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে, এবং সম্প্রতি রাফাহ অভিযান বন্ধ করার আদেশ দিয়েছে (যদিও এর ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে)। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এর প্রসিকিউটর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে হামাস এবং ইসরায়েলের নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন।


সংক্ষেপে:

আজকের গাজা গভীর মানবিক দুর্ভোগ এবং শারীরিক ধ্বংসযজ্ঞের একটি প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে রাফাহ এবং অন্যান্য স্থানে সক্রিয় সংঘাত চলছে, যেখানে জনগণ অনাহার, রোগ এবং অবিরাম বিপদের সম্মুখীন, এবং যাওয়ার মতো কার্যত কোনও নিরাপদ স্থান নেই। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং অত্যাবশ্যকীয় ত্রাণ সরবরাহ অত্যন্ত অপ্রতুল এবং চলমান শত্রুতা ও প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অনিশ্চিত, যেখানে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বেঁচে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনা নির্ভর করছে শত্রুতার অবসান, ব্যাপক মানবিক হস্তক্ষেপ এবং অবশেষে বিশাল পুনর্গঠন প্রচেষ্টা ও একটি রাজনৈতিক সমাধানের উপর, যা এখনও অধরা।

No comments

Theme images by Bim. Powered by Blogger.